ক্যালসিয়াম কী? শরীরে ক্যালসিয়ামের ভূমিকা

ক্যালসিয়াম হাড়ের জন্য প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালসিয়ামের ঘাটতি মেটাতে অনেকে বিভিন্ন ব্রান্ডের ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট গ্রহন করি। সামান্য একটু শরীর, হাত-পা ব্যথা করলেই ক্যালসিয়ামের বড়ি খাওয়া একদম উচিত নয়। কেননা প্রতিদিনের খাবারে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম রয়েছে যা দেহে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ করে।

ক্যালসিয়াম দাঁত ও হাড় মজবুত করতে সাহায্য করে এবং ক্ষয় রোধে কাজ করে। এর অভাবে অস্টিওপোরাসিস রোগ হতে পারে এছাড়া মাংসপেশি ,হৃতস্পন্দন ও স্নায়ুকে স্ববল রাখতেও ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন প্রয়োজন।  

ক্যালসিয়াম কী

ক্যালসিয়ামের রাসায়নিক সাংকেতিক সংক্ষিপ্ত নাম Ca যা একটি মৌলিক পদার্থ এবং যার পারমানবিক সংখ্যা 20 এবং এটি ক্ষারীয় ধাতব পদার্থ। যার ফলে ক্যালসিয়াম বেশ সক্রিয় ধাতু, যা বায়ু বা বাতাসের সংস্পর্শে আসার পরে গাঢ় অক্সাইড-নাইট্রাইড স্তর গঠন করে। ক্যালসিয়ামের গাঠনিক ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যসমূহ গুলোর অধিকাংশ মিলে যায় এর থেকে কিছু ভারি এবং সদৃশ মৌল বেরিয়াম ও স্ট্রনশিয়ামের সঙ্গে। ক্যালসিয়াম পরমাণুর দিক থেকে পৃথিবীর ভূ-ত্বকের উপাদানগুলির ভিতরে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে প্রাচুর্যের দিক দিয়ে ক্যালসিয়াম পৃথিবীতে প্রাপ্ত ধাতুসমূহের ভিতরে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ অ্যালুমিনিয়াম ও লোহার পরেই এটির অবস্থান।পৃথিবীতে সর্বাধিক পরিমাণে পাওয়া যায় এমন ক্যালসিয়াম যৌগটি হচ্ছে ক্যালসিয়াম কার্বোনেট, যা চুনাপাথর নামে সুপরিচিত।

শরীরে ক্যালসিয়ামের ভূমিকা কী

শরীরে হাড় ও দাঁত মজবুত করে ক্যালসিয়াম এবং শরীরের কোথাও কেটে গেলে রক্ত জমাট বাঁধতে কাজ করে। ক্যালসিয়ামের প্রধান উৎস হচ্ছে সবুজ শাকসবজি, বাদাম, দই ইত্যাদি। ক্যালসিয়াম দেহের বিকাশ ও মাংসপেশী গঠনে সাহায্য করে থাকে এবং দেহ গঠনে ক্যালসিয়ামের গুরুত্ব অপরিসীম। আবার স্নায়ুতন্ত্রের নানান সংকেত আদান-প্রদান ছাড়াও বিভিন্ন রকমের হরমোন নিঃসরণে ক্যালসিয়াম সহায়তা করে।

এই মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টটি খাবারে যথেষ্ট পরিমাণে থাকলে নারীদের রজঃনিবৃতির পর হাড় ক্ষয় নামের অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধসহ কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধ ও হাইপারটেনশন প্রতিরোধে কাজ করে।

সাধারণত বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে দেহে ক্যালসিয়ামের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা, ভিটামিন ডি এর অভাব, খাবারে ক্যালসিয়াম কম থাকা, ক্যালসিয়াম শোষিত না হওয়া এবং হরমোনজনিত সমস্যা ও মহিলাদের রজঃবৃত্তির পর দেহের হাড়ে সঞ্চিত ক্যালসিয়াম কমে গিয়ে শরীরের হাড় পাতলা ও ভঙ্গুর হয়। অনেক সময় কিডনিজনিত সমস্যার কারণেও ক্যালসিয়াম হ্রাস পায়।

নিম্নে ক্যালসিয়ামের ভূমিকা আলোচনা করা হলো

  • রক্ত জমাট বাধতে সহায়তা করে।
  • ক্যালসিয়াম পেশী ফিট রাখার জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
  • ক্যালসিয়াম দেহে রক্ত সঞ্চালনের জন্য দরকার।
  • ওজনের ভারসাম্য বজায় রাখতে ক্যালসিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে।
  • শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হলে হাটু এবং জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যথা করে।
  • অন্যান্য রাসায়নিক এবং হরমোন সক্রিয় করতে সাহায্য করে।
  • গর্ভাবস্থার বিভিন্ন প্রকার ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে ক্যালসিয়াম বেশ উপকারী।

শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব হলে বিভিন্ন রকম সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং দেহের ক্ষতি হতে পারে। এর ঘাটতির কারণে যে সমস্যা হতে পারে তা নিম্নে দেয়া হলো।

হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়

বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে শরীরে হাড়ের সঞ্চিত ক্যালসিয়াম কমতে থাকে। যার কারণে হাড়ে ক্যালসিয়ামের ঘনত্ব কমে যায় এবং অস্টিওপরোসিস বা হাড়ে ছোট ছোট ছিদ্র লক্ষ করা যায়, আর এইসব হাড় ভঙ্গুরতার ফলেই হয়।

রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কম

শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ক্যালসিয়াম। ক্যালসিয়ামের অভাব হলে প্যাথোজেন বা জীবাণু মোকাবেলা করার শক্তি কমে যায়।

পেশী সংকোচন

পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করার পর ও শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক থাকা সত্ত্বেও   যদি নিয়মিত মাংসপেশী সংকুচিত হয়, অর্থাৎ খিঁচুনি হয়, তাহলে বুঝে নিতে হবে যে দেহে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি রয়েছে।

অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন

হৃৎপিণ্ডের সঠিক কার্য চালনার জন্য ক্যালসিয়াম অত্যন্ত জরুরী। কারণ ক্যালসিয়াম কমে গেলে হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হয়ে যায় এবং এটি হৃৎপিণ্ডকে রক্ত পাম্প করতে সাহয্য করে।

স্নায়ুবিক সমস্যা

ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হলে নানা প্রকার স্নায়ুবিক সমস্যা দেখা দিতে থাকে। যেমন- কারপাল স্পাজম, মুখের চারপাশের মাংসপেশী ঝিমঝিম করা এবং রোগীর প্রেসার মাপার সময়  হঠাৎ হাত বাঁকা হয়ে যাওয়া, এগুলো  ছাড়াও হাইপোক্যালসেমিয়া টিটেনি নামের গুরুত্ব সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কী পরিমাণে ক্যালসিয়াম প্রয়োজন

একজন সুস্থ্য স্বাভাবিক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে দৈনিক প্রায় ১০০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়ামের চাহিদা রয়েছে। ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হলে অস্টিওপোরাসিস বা হাড়ক্ষয় রোগ হতে পারে।

মানুষের শরীরে প্রায় ৯৯% ক্যালসিয়াম দাঁত ও হাড়ে থাকে। হাড় বৃদ্ধি, বিকাশ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ক্যালসিয়াম  প্রয়োজনীয়। নবজাতকরা বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ক্যালসিয়াম তাদের হাড় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । যেসব নারীরা ইতিমধ্যে মেনোপজের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন তারা পুরুষ বা অল্প বয়স্কদের চেয়ে অধিক হারে তাদের হাড়ের ঘনত্ব হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের অস্টিওপরোসিস হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে এবং এমন সমস্যায় ভোগা রোগীদেরকে ডাক্তাররা ক্যালসিয়াম সেবন করার পরামর্শ দেন। 

একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের প্রতিদিন 1000 মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা উচিত। গর্ভাবস্থা ও যাদের বয়স বেশি বা 50 বছরের বেশি এবং বাচ্ছাকে বুকের দুধ পান করাচ্ছেন এমন মাহিলাদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন কমপক্ষে 1200 মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম দরকার রয়েছে। আবার ভিটামিন ডি কেতে পারেন, কারণ এটি দেহে ক্যালসিয়ামকে শোষন করতে সহায়তা করে। তবে ভিটামিন ডি পাওয়া যায় সকালের সূর্যের আলো থেকে।

ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার

শরীরে যাতে ক্যালসিয়ামের অভাব না হয় তার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার খেতে হবে। শরীর সুস্থ্য রাখার জন্য ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার খাওয়া প্রয়োজন। প্রায় মানুষেই হাড়ের যত্নের ক্ষেত্রে খুবই উদাসীন এবং কফি, চা, লবণ ও সফট ড্রিংক খাওয়ার অভ্যাস, প্রাণীজ প্রোটিন বা অতিরিক্ত প্রেটিন হাড়ের প্রচুর ক্ষতি করে। তবে অনেক খাবার রয়েছে যা খেলে হাড় ক্ষয়রোধে সহায়তা করে এবং হাড় মজবুত ও শক্ত হয়।

  • কমলালেবু, পাতিলেবুসহ টক জাতীয় ফল হাড়ের জন্য অত্যাধিক উপকারী এবং লেবুতে সাইট্রিক অ্যাসিড ও ভিটামিন সি রয়েছে যা ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ করতে সহায়তা করে।
  • কাঠ বাদামে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম রয়েছে, যা দ্রুত শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণ করতে সাহায্য কর।
  • ঢেড়ঁস নিয়মিত খেলে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ হয় এবং প্রায় ১৭২ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়ম রয়েছে ৫০ গ্রাম ঢেড়ঁসে। তাই নিয়মিত ঢেড়ঁস খাওয়া আবশ্যক।
  • ব্রোকলি সবজিটি ক্যালসিয়ামে ভরপূর,যা শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি মেটায় এবং হাড় মজবুত করতে সহায়তা করে।
  • সয়াবিন তেলও ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ করে থাকে এবং প্রায় ১০০ গ্রাম সয়াবিনে ১৭৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম রয়েছে।

ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার গুলো কী কী

সবুজ শাক-সবজিতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম রয়েছে, যা শরীরের জন্য খুবই উপকারী। পুদিনা পাতা, মেথি ও পালং শাকের মতো সবুজ সবজিতে ভিটামিন, আয়রনসহ ক্যালসিয়াম রয়েছে। লেবু, মসূর ডাল, মটরশুটি, ছোলা, সয়াবিন ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম বিদ্যমান রয়েছে।

এছাড়াও পাতাযুক্ত শাকসবজিতেও রয়েছে অধিক। বাঁধাকপি, ফুলকপি, গাজর, সরিষার পাতা, ব্রোকলি, কলার্ড গ্রিনস, শালগম, ব্রাসেলস স্প্রাউট, চাইনিজ বাঁধাকপি, সরিষা ইত্যাদি এবং ক্যান্সার প্রতিরোধে এই সবজিগুলো খাওয়ানো হয়।

আবার ক্যালসিয়ামের উৎসের ভিতরে শুকনো ফলও অন্তর্ভুক্ত। এগুলো ক্যালসিয়াম ও পুষ্টিগুণে ভরপূর। শুকনো ফল সকাল ও বিকালের নাস্তার তালিকায় রাখতে পারেন। বাদাম, শুকনো ডুমুর, কিসমিস, শুকনো এপ্রিকট, কমলালেবু, আঙ্গুর, স্ট্রবেরি, ব্ল্যাকবেরি, ইত্যাদি।

তাছাড়াও গরুর দুধ, ছাগল ও মহিষের দুধে ক্যলসিয়াম অধিক পরিমাণে রয়েছে। পনির একটি সুস্বাদু ফল, যাতে প্রচুর ক্যালসিয়াম রয়েছে এবং এটি সবার প্রিয় ফল। পনির বিভিন্ন উপায়ে খেতে পারেন। যেমন- সান্ডউইচ, পাকোড়া, পনির কারি।

ফলমূল, দুধ ও সবুজ শাকসবজির মতো অন্যান্য ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবারেও দই অন্তর্ভুক্ত। দই যে শুধুমাত্র ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার এমনটা নয়, দইয়ে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন, জিঙ্ক, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-ডি এবং আয়োডিন। যারা দুধ খেতে পারেন না তারা দই খেতে পারেন, এতে অনেক উপকার হবে এবং ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ হবে।

শুধু নিরামিষ খাবারে যে ক্যালসিয়াম আছে তা নয়, কিছু  কিছু আমিষ জাতীয় খাবারও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ। ঘরোয়া ভাবে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ করতে মাংস, ডিম এবং সামুদ্রিক মাছ খাবার তালিকায় রাখতে পারেন। ডিম (কাঁচা),  ও ১০০ গ্রাম স্যামন মাছে প্রায় ২৪. ৩০ মিলিগ্রাম , টুনা মাছে ৯.৮২ মিলিগ্রাম, চিংড়ি মাছে ৬৭.৯৯ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম রয়েছে।

এই আর্টিকেলে আমরা ক্যালসিয়াম ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার সম্পর্কে জানলাম। আপনাদের আরো কিছু জানার থাকলে নিম্নের কমেন্ট বক্সে জানাবেন। ধন্যবাদ।

Leave a Reply